নাটকটির বিষয়সংক্ষেপ : প্রথম দৃশ্যে লক্ষ করা যায়—সমাজের নিম্নশ্রেণির মানুষের জীবনসংগ্রামের এক জীবন্ত চিত্র। অস্পষ্ট আলোয় লেখক তাদের অন্তঃপুরের যে ছবি তুলে ধরেছেন তা দেখে তাদের বাসস্থানের হতশ্রী চেহারা ধরা পড়ে। একদিকে তাদের যেমন খাদ্যের অভাব অন্যদিকে তাদের বাঁচার জন্য সুস্থ পরিবেশের অভাবও এক্ষেত্রে ধরা পড়েছে। এখানে পুরুষ (নেত্যর বাবা), নেত্য ও নেত্যর মা—এই তিনটি প্রতীক চরিত্র সমাজের অতিদরিদ্র পরিবারের সদস্য হয়ে নাটকে দেখা দিয়েছে। আসলে যুদ্ধোত্তর দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলার গ্রামেগঞ্জে নেত্যদের পরিবার হাজারে হাজারে। রাতের অন্ধকার কাটতে না কাটতেই তাদের জীবনসংগ্রাম শুরু হয়ে যায়। কোনো এক অজানা আশঙ্কায় যেন নেত্যর বাবার ঘুম ভেঙে যায়। দুর্ভিক্ষপীড়িত সময়ে একমুঠো চাল সংগ্রহের লড়াইটা, সংগ্রামটা যেন তার চোখের সামনে বারে বারে ভেসে ওঠে। তাই নেত্যর বাবা; নেত্য ও তার মাকে তাড়া দিয়ে ঘুম থেকে তুলে দিতে চায়। কারণ গ্রাম থেকে কিছু জিনিসপত্র (কলমি শাক, দাঁতন কাঠি, কলা ইত্যাদি) নিয়ে গিয়ে সেগুলি বিক্রি করে সামান্য যেটুকু অর্থ আয় হবে তা নিয়েই দাঁড়াতে হবে লাইনে একমুঠো চালের জন্য। বুভুক্ষু মানুষের প্রতিযোগিতা এতটাই তীব্র যে, সময়মতো লাইনে দাঁড়াতে না-পারলে চাল পাওয়া মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। পেটের টান বড়ো বালাই যে, তাই সংগ্রামটা শুরু করতে হয় খুব সকালেই।
দ্বিতীয় দৃশ্যে লক্ষ করা যায়—এক কৃষাণের একক সংলাপ। কথায় আছে, ‘আশায় বাঁচে চাষা'–এ যেন তারই প্রতিচ্ছবি। চাষি তার স্ত্রীকে চৈতিফসল-পর তাদের সুখের গল্প শোনায়। নাট্যকার কৃষাণির মুখে কোনো সংলাপ না-দিয়ে শুধু ভাবলেশহীনভাবে তাকানোর মধ্যে 'সুখ' যে তাদের কাছে মরীচিকামাত্র তা বুঝিয়ে দিয়েছেন। চাষি স্বগতোক্তির মধ্য দিয়ে নিজের সহ্যক্ষমতাকে আরও দৃঢ় করেছে। মাঠের দিকে যেতে যেতে কৃষাণ কৃষাণিকে পরামর্শ দিয়ে যায় শহরে গিয়ে আগেভাগে চালের লাইনে দাঁড়াতে। কারণ মাঠ থেকে ফিরে এসে তার পেটে যেন ক্ষিদের আগুন জ্বলে ওঠে। কৃষাণির নিরুত্তর থেকে চাহনি অনেক অর্থ বহন করে। আর সে অর্থ চাষি বুঝতে পারে বলেই কৃষাণির উদ্দেশ্যে বলে—‘ফের আবার ওইরকম করে তাকাচ্ছিস মুখপানে।' আসলে কৃষাণির দৃষ্টির সামনে চাষির অসহায়তা প্রকট হয়েছে। এ যেন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে একটা ছলনার অভিনয় অভিনীত হল, যা চাষি মৃদু হেসে কিছুটা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
তৃতীয় দৃশ্যে ক্ষুধার আগুন যে কতটা ভয়ংকর তা কারখানার শ্রমিক সতীশের কথাবার্তা ও আচার আচরণের মধ্যেই লক্ষ করা যায়। সতীশ খুব সকালে উঠে তার মেয়ে ফুলকিকে উদ্দেশ্য করে তার স্ত্রী ক্ষিরিকেও জাগিয়ে তুলতে চায়। উদ্দেশ্য একটাই জঠরাগ্নি অর্থাৎ ক্ষুধার আগুন নিভিয়ে সতীশ কারখানায় যাবে। প্রতিবেশী সহকর্মী জুড়োনের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে থাকে। কথার প্রসঙ্গ ধরে উঠে আসে একাকী জুড়োনের ভালো থাকার কথা, তিনমাস ধরে মিথ্যা চালের আশ্বাস দেওয়ার কথা। জুড়োনের কথার মধ্য দিয়ে উঠে আসে কোম্পানির ওপর ভরসা করা যে কতটা অবাস্তব-অন্তত চালের ব্যাপারে। সতীশের সে-কথা শুনে বিশ্বাসভঙ্গের কথা মনে পড়ে এবং সে উত্তেজিত হয়ে বলে ওঠে—“তাহলে কাকে বিশ্বাস করব?” নিজের প্রতি, ভাগ্যের প্রতি ধিক্কার জানিয়ে অত্যন্ত রুঢ়কণ্ঠে সতীশ ফুলকি ও তার মায়ের উদ্দেশে চিৎকার করে বলে ওঠে—“তোদের ঘুমের জন্য কারখানার গেট খোলা থাকবে নাকি?” আসলে সতীশের এই আস্ফালন শুধুমাত্র একটু খাবারের জন্য। কিন্তু সাংসারিক অভাব যে পারিবারিক সম্পর্কের ওপর কতটা আঘাত হানে তা ক্ষিরি ও সতীশের মধ্যে ঘটে যাওয়া ঘটনাই আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। এই অভাব শুধু পারস্পরিক দোষারোপের মধ্যে তখন সীমাবদ্ধ থাকে না – তা পৌঁছোয় হাতাহাতি সংঘর্ষে। তাই তৃতীয় দৃশ্যের শেষে সতীশকে দেখি স্ত্রীকে লাথি পর্যন্ত মারতে। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় দৃশ্যে যখন লক্ষ করি খেটেখাওয়া নিম্নবিত্ত পরিবার, কৃষক, শ্রমিক সকলেই প্রায় ক্ষুধার আগুনে একটু একটু করে দগ্ধ হচ্ছে, তখন চতুর্থ দৃশ্যে হরেকৃষ্ণবাবুর মতো মধ্যবিত্ত পরিবারও যে সে আগুন থেকে রেহাই পায়নি তাও লক্ষ করা যায়। তীব্র অনিশ্চয়তার মধ্যে তাদেরও যে দিন কাটছে তা হরেকৃষ্ণবাবু ও মনোরমা দেবীর কথাবার্তার মধ্য দিয়ে সহজেই অনুমান করা যায়। তা ছাড়া মধ্যবিত্ত কেরানি হরেকৃষ্ণবাবু অফিসে যে চাল-ডাল নিয়ে ম্যানেজার ও তার মোসাহেবরা একটা কালোবাজারি করছে তা বুঝতে পেরেও কিছু করতে অর্থাৎ প্রতিবাদ করতে পারছে না। শুধু রক্ষকই ভক্ষক এই বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কিছু করণীয় নেই। হতাশাব্যঞ্জক আক্ষেপ নিয়ে চালের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। ঈশ্বরে বিশ্বাসী স্ত্রী মনোরমা দেবী হরেকৃষ্ণবাবুকে ঠাকুর প্রণামের কথা মনে করিয়ে দিলে ঈষৎ ব্যঙ্গের সুরে তিনি স্ত্রীর উদ্দেশ্যে বলেন—“সুবিধে হবে হলে মনে করছ, আচ্ছা!” চারটি খণ্ডদৃশ্যের মধ্য দিয়ে বিজন ভট্টাচার্য সমস্যার সংকটময় মুহূর্তটি দর্শকদের সামনে আনতে সমর্থ হন। পঞ্চম বা পরিণতি দৃশ্যে ওড়িয়া, প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ পুরুষ এবং জনৈক যুবক ও মুসলমান ভাই সমবেত হয়ে জাতিগত বিভেদ দূরে রেখে একত্রিত হয়ে বাঁচার একটা তাগিদ অনুভব করে। সব পথ এসে শেষে যেন মিলে গেল ঐক্যের সাগরে। পাশাপাশি লাইনে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে সামান্য গোলযোগ ঘটলেও সিভিক গার্ড ও দোকানদারের কথার তীব্র প্রতিবাদ করে সমবেতভাবে। দুর্ভিক্ষের বাজারে চোরাকারবারি, এক শ্রেণির শোষকের বিরুদ্ধে এ যেন সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ। সিভিক গার্ড দ্বিতীয় পুরুষ ও চতুর্থ পুরুষের লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে যে ঔদ্ধত্যপূর্ণ ব্যবহার করেছে তার বিরুদ্ধে লাইনে দাঁড়ানো অন্যান্য চরিত্রগুলি প্রতিবাদ করেছে। দোকানির বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ গড়ে তুলতেই উভয়েরই সুর শেষমেশ কিছুটা হলেও নরম হয় এবং সকলেই সুষ্ঠুভাবে লাইন দিয়ে চাল পায় এবং অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছোতে পারে। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে সকলেই বুঝতে পারে এক না-হলে চলবে না। তৃতীয় পুরুষের বক্তব্য থেকে তা স্পষ্ট—“আর মনে করাকরিই বা কেন? যথেষ্ট তো হয়েছে, এখন বাঁচতে হবে, বাঁচতে হলে একসাথে চলতে হবে।” এই উপলব্ধিই ছোটো কল্পনাটক ‘আগুন' নাটকের প্রধান প্রাপ্তি। বাঁচতে হলে জোট বাঁধতে হবে।
আগুন নাটক ক্লাস 11, আগুন নাটক, আগুন নাটকের বিষয়বস্তু, বিজন ভট্টাচার্যের আগুন নাটক ক্লাস 11, class 11 নুন, class 11, আগুন নাটক কার্টুন, আগুন নাটক ক্লাস ১১, আগুন নাটক আলোচনা, আগুন নাটক বিশ্লেষণ, আগুন নাটক সেমিস্টার 2, আগুন নাটক বিষয়বস্তু, আগুন নাটক একাদশ শ্রেণি, একাদশ শ্রেণি আগুন নাটক, আগুন নাটক সম্পূর্ণ পাঠ, আগুন নাটক একাদশ শ্রেণী, আগুন নাটক তৃতীয় দৃশ্য, আগুন নাটকের সাজেশন
রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর (Mark : 5)
Q1. ‘আগুন' নাটকটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।
❑ লেখক তাঁর কাব্য, নাটক, গল্পের একটা নাম দেন বা সেগুলিকে একটি অভিধায় চিহ্নিত করেন, একেই বলে নামকরণ। নামকরণের প্রাক্কালে লেখকরা কতকগুলি বিষয়ের ওপর লক্ষ রাখেন, সেগুলি হল–ঘটনা, চরিত্র ও ব্যঞ্জনা। এখন আলোচ্য মূল বিষয় হল বিজন ভট্টাচার্যের 'আগুন' নাটকটিতে নামকরণের কোন রীতিকে অনুসরণ করেছে এবং তা কতখানি বাস্তবোচিত ও সার্থক।
‘আগুন' নাটকের কাহিনির দিকে যদি লক্ষ করি তবে সেখানে পাঁচটি দৃশ্য লক্ষ করা যায়। প্রথমটিতে সাধারণ সবজি বিক্রেতার পরিবার। দ্বিতীয় দৃশ্যে কৃষক পরিবার, তৃতীয় দৃশ্যে কারখানার শ্রমিক পরিবার এবং চতুর্থ দৃশ্যে কেরানি হরেকৃষ্ণবাবুর মধ্যবিত্ত পরিবার। বিভিন্ন শ্রেণির চারটি পরিবারের সমস্যা কিন্তু এক–চাল ও চালের আকাল। এই চাল অর্থাৎ খাদ্যবস্তু যা মানুষের ক্ষুধার আগুন অর্থাৎ পেটের জ্বালার নিবারণ করতে পারে। নাটকে উল্লিখিত চারটি পরিবারের প্রতিনিয়ত যে সংগ্রাম তা হল বেঁচে থাকার সংগ্রাম, ক্ষুধার আগুনকে নির্বাপিত করার জন্য একমুঠো চালের জন্য সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার সংগ্রাম। যেখানে অনিশ্চয়তা প্রতি মুহূর্তে মনোবলকে খান খান করে ভেঙে দিতে উদ্যত। আর এই অভাব থেকেই দেখা যায় পারিবারিক বিবাদের ও মনোমালিন্যের ছাই চাপা আগুনের আভাস। চারটি খণ্ড দৃশ্যের মধ্য দিয়ে নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য পঞ্চাশের মন্বন্তরের কিছু আগেই খাদ্য মজুত করে কৃত্রিম খাদ্যাভাব তৈরি করে যে সমস্যার সৃষ্টি হয় সেই রূপটি দর্শকের সামনে আনতে সমর্থ হয়েছেন। পঞ্চম বা পরিণতির দৃশ্যে আরও বহুর সাথে চালের লাইনে দাঁড়িয়ে বহুবিধ সমস্যা, অপমান, পুলিশের অযথা খবরদারি, দোকানদারের অপমানজনক মন্তব্য, লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে নিজেদের মধ্যে মৃদু গণ্ডগোল এবং পরিশেষে একে অন্যের হয়ে কথা বলায় কিছুটা প্রতিবাদী সুর একত্রিত হয়। পঞ্চম দৃশ্যে কলহরত জনতার সামনে যখন জনৈক যুবক আগুন আগুন বলে ওঠে, সবাই তখন উদ্গ্রীব হয়ে জিজ্ঞাসা করে ওঠে—“আগুন কোথায়?” যুবক সকলের কাছে হাতজড়ো করে বলে ওঠে—“আগুন জ্বলছে আমাদের পেটে।” নাট্যকার যুবকের জবানীতে এ কথা বলিয়ে নিয়ে নাট্যকাহিনির একটা বৃত্ত সম্পন্ন করেছেন। পরবর্তীতে লাইনের মধ্যে যখন প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের আগুন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছিল তখন সিভিক গার্ড ও দোকানদারের সুর নরম হয়। মানুষের একসাথে এমন প্রতিবাদের ভাষা থেকে বেশ বোঝা যাচ্ছিল এমন প্রতিবাদ জঠরের আগুনকে নির্বাপিত করতেই। সামগ্রিক আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যেতে পারে ‘আগুন' এই ব্যঞ্জনাধর্মী নামকরণটি যথাযথ ও সার্থক হয়েছে। গণনাট্য আন্দোলনের মূল যে লক্ষ্য—বিপ্লবের আগুন জ্বালিয়ে শোষণ, কালোবাজারি, জোতদার জমিদারদের অত্যাচারকে নিশ্চিহ্ন করা—তা এই নাটকের শেষে কিছুটা হলেও সার্থকতা লাভ করেছে।
Q2. বাংলা গণনাট্য আন্দোলনের প্রথম ফসল ‘আগুন’— এ সম্পর্কে আলোচনা করো।
❑ ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে সর্বভারতীয় গণনাট্য সংঘ প্রতিষ্ঠিত হলে বাংলা গণনাট্য সংঘ তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। বিজন ভট্টাচার্য এই গণনাট্য সংঘের অনুপ্রেরণা ও উৎসাহেই প্রথম লেখেন ছোটো নাটক ‘আগুন' এবং নাটকটি ওই বছরেই গণনাট্য সংঘের প্রযোজনায় অভিনীত হয়। নাটকের মধ্য দিয়ে যে শ্রেণিসচেতন সমাজবিশ্লেষণ এবং প্রতিবাদ ও সংগ্রামের জেহাদ ভারতীয় গণনাট্য সংঘ করতে চেয়েছিল, বিজন ভট্টাচার্য তারই ভাবনায় উদ্দীপ্ত হয়ে নাট্যরচনার জন্য কলম ধরলেন।
গণনাট্যের প্রথম প্রয়াস 'আগুন'। মোট পাঁচটি দৃশ্য। প্রথমটিতে সাধারণ সবজি বিক্রেতা পরিবার, দ্বিতীয় দৃশ্যে কৃষক পরিবার, তৃতীয় দৃশ্যে কারখানার শ্রমিক পরিবার এবং চতুর্থ দৃশ্যে কেরানি হরেকৃষ্ণবাবুর মধ্যবিত্ত পরিবার। বিভিন্ন শ্রেণির চারটি পরিবারের সমস্যা এক —চাল, চালের আকাল । পঞ্চাশের মন্বন্তরের কিছু আগেই খাদ্য মজুত করে কৃত্রিম খাদ্যাভাব সৃষ্টির বিষয়টি ও তার সমস্যা নিয়ে এ নাটকে এসে হাজির হয়। চারটি খণ্ডদৃশ্যের মধ্য দিয়ে বিজন ভট্টাচার্য সমস্যার সংকটময় রূপটি দর্শকের সামনে নিয়ে আসতে সমর্থ হয়েছেন। পঞ্চম বা পরিণতির দৃশ্যে আরও বহুর সঙ্গে চালের লাইনে দাঁড়িয়ে বহুবিধ সমস্যা, অপমান, পুলিশের অযথা খবরদারি, দোকানির অপমানজনক মন্তব্য ইত্যাদির পাশাপাশি লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে নিজেদের মধ্যে মৃদু গোলমাল এবং একে অপরের হয়ে কথা বলায়, কিছুটা প্রতিবাদী হয়ে ওঠায় পুলিশ এবং দোকানি দুই পক্ষই কিছুটা নরম হয় এবং সকলেই চাল পেয়ে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছোতে পারে। সকলেই বুঝতে পারে—“এক না হলে চলবে না । এই উপলব্ধিই ছোটো কল্পনাটক 'আগুন' নাটকের প্রধান প্রাপ্তি। 'বাঁচতে হলে জোট বাঁধতে হবে।’—যা গণনাট্য আন্দোলনের মূল লক্ষ্যকেই সমর্থন করে।
Q3. ‘আগুন' নাটকের সংলাপ রচনা সম্পর্কে আলোচনা করো।
❑ নাটকের ক্ষেত্রে সংলাপ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নাট্যকাহিনি পরিবেশনে নাট্যকারের প্রধান অবলম্বন সংলাপ। সংলাপের মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে নাটকের পাত্রপাত্রীর চরিত্রবৈশিষ্ট্য। সংলাপ চরিত্রোপযোগী না হলে নাটক নিষ্প্রাণ হয়ে ওঠে। এই কারণে সংলাপ রচনার ক্ষেত্রে নাট্যকারকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হয়। নাটকে সংলাপের এই গুরুত্বের কথা মনে রেখে বিজন ভট্টাচার্যের ‘আগুন' নাটকটিতে নাট্যকারের সংলাপ রচনার দক্ষতার বিষয়টি আলোচনা করা যেতে পারে।
'আগুন' নাটকে চরিত্রের সঙ্গে সংলাপকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলতে নাট্যকার চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখেননি। চরিত্র-স্বভাব এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী যে চরিত্রের পক্ষে ঠিক যেরকম কথা বলা স্বাভাবিক; নাট্যকার সেই চরিত্রের মুখে ঠিক সেইরকম কথা বসিয়েছেন। এই নাটকের প্রথম দৃশ্যে সাধারণ সবজি বিক্রেতার পরিবারের কথা ও মন্বন্তরের প্রেক্ষিতে তাদের অবস্থা দেখানো হয়েছে। “... ঐগুলো বিক্রি করে শেষ পরে তো নাইনি গে চাল কিনবি।”— সংলাপটির মধ্যে যে উদ্বেগ ধরা পড়েছে তাতে স্বাভাবিকভাবেই বোঝা যাচ্ছে তাদের লড়াইটা কত কঠিন। দ্বিতীয় দৃশ্যে কঠিন সামাজিক অবস্থার মধ্যে মানুষ যে হতাশ হয়েও ভেঙে পড়েনি তা কৃষাণের সংলাপে প্রকাশ পেয়েছে—“আর কটা দিন একটু কষ্ট কর”। তৃতীয় দৃশ্যে সতীশ ও ক্ষিরির সংলাপ অভাবজনিত কারণে পারিবারিক সম্পর্কগুলির যে করুণ অবস্থা হয় তা লক্ষ করা যায় – “দেখে এসোগে, কেলোর বাবা কেলোর মাকে কী হালে রেখেছে। কী আমার পুরুষমানুষ রে।” চতুর্থ দৃশ্যে মধ্যবিত্ত কেরানি ও তার স্ত্রীর কথোপকথনের মধ্যেও তাদের আশা, বিশ্বাস ফুটে উঠেছে—“ওকি, ঠাকুর নমস্কার করে বেরুলে না!” শেষ দৃশ্যে মূলত লেখক কালোবাজারি, শোষণ এবং প্রতিবাদের কথা দেখিয়েছেন। সিভিক গার্ডের “থাক, তোকে আর দালালি করতে হবে না। যা ভাগ্ ভাগ্।” কিংবা “মানুষ নাকি!” উক্তির মধ্যেই সে-কথা ধরা পড়েছে। তা ছাড়া দোকানির উক্তির মধ্যেও বেশ ব্যঙ্গের ছবি ধরা পড়েছে। নাটকের শেষদিকে সামান্য চালের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে ঠেলাঠেলি করার কারণে চতুর্থ পুরুষ ও অন্যদের মহাজনের লোকের হাতে মার খেতে হয়, মার খাওয়ার পর “এখন বাঁচতে হবে। বাঁচতে হলে মিলেমিশে থাকতে হবে ব্যাস্ ।”–এই সংলাপই এ নাটকের মূল উদ্দেশ্যকে সম্পূর্ণ করেছে। সব মিলেয়ে নাট্যকার যে একজন সুদক্ষ সংলাপ রচয়িতা সে-কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।
Q4. ‘আগুন' নাটকের চতুর্থ দৃশ্যে হরেকৃষ্ণ ও মনোরমার সংলাপের মধ্য দিয়ে যে ছবিটি ফুটে উঠেছে তা নিজের ভাষায় লেখো।
❑ নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য তাঁর 'আগুন' নাটকের চতুর্থ দৃশ্যে এক মধ্যবিত্ত পরিবারের ছবি তুলে ধরেছেন। যার কুশীলব হরেকৃষ্ণ ও তার স্ত্রী মনোরমা। রবীন্দ্রনাথের 'ক্ষণিকা' কাব্যগ্রন্থের ‘মাঝারির সতর্কতা' কবিতায় কবি বলেছেন “তিনিই মধ্যম যিনি চলেন তফাতে”–এ কথা হরেকৃষ্ণ ও মনোরমার কথোপকথনের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রায় সতর্কতা সবচেয়ে বেশি। কারণ তারা মন এবং অর্থ উভয় অর্থেই মধ্যবিত্ত। তারা মহৎ উদার চরিত্রের মতো সহজে ব্যাপ্ত হতে পারে না। আবার মনের দিক থেকেও দেউলিয়াগ্রস্ত, অধম শ্রেণির মানুষদের ভয়ংকর ভেবে তারা দূরে সরিয়ে রাখে। নাট্যকার অত্যন্ত সুচতুরভাবে প্রথম তিনটি দৃশ্যে পারিবারিক অসন্তোষকে বে-আব্রু করে তুলে ধরেছেন এবং চতুর্থ দৃশ্যে চিরাচরিত মধ্যবিত্ত মননকে তুলে ধরেছেন; মনোরমা ও হরেকৃষ্ণর কথোপকথনে যার ইঙ্গিত মিলেছে। অন্তঃপুরবাসী মনোরমা কিন্তু বহির্জগতের সব খবর রাখে। সে ভোঁদার কাছে শোনা দু-সের চাল দেওয়ার কথা হোক কিংবা স্বামীর অফিস থেকে কোনো কিছু দেওয়ার কথাই হোক। তা ছাড়া তার মননে যে সুযোগসন্ধানী সত্তা আছে তা ধরা পড়ে যখন সিভিক গার্ডকে পূর্বেকার মতো চিনির ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে। কিছুটা হলেও স্ত্রৈণ হরেকৃষ্ণর মধ্যে প্রতিবাদহীনতা লক্ষ করা যায়। কারণ অফিসের দুর্নীতি দেখেও সে মুখ খোলেনি, শুধুমাত্র গৃহের পরিসরে 'রক্ষকই ভক্ষক' ইত্যাদি নীতিকথা আওড়েছে। মনোরমা ও হরেকৃষ্ণর মধ্যে আস্তিকতার যেটুকু পরিচয় পাওয়া যায় তা অবশ্যই স্বার্থসিদ্ধির জন্য। আসলে মনোরমা ও হরেকৃষ্ণরা মধ্যবিত্তের দরজা হাট করে খুলতে পারেনি। এ দৃশ্যে তারা চিরাচরিত মধ্যবিত্তের প্রতিনিধি হয়েই থেকে গেছে; নিজেদেরকে নির্দিষ্ট দূরত্বে রেখে।
Q5. 'চাল আজ আর পাতি হবে নানে দেহিসখেন – কে, কাকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলি বলেছে? বক্তার এমন আশঙ্কার কারণ কী? (Mark : 2+3=5)
❑ উদ্ধৃত অংশটির বক্তা হল বাংলার গণনাট্য আন্দোলনের পথিকৃৎ, বিশিষ্ট লেখক, নাট্যকার, অভিনেতা বিজন ভট্টাচার্যের প্রথম নাটক ‘আগুন’-এর প্রথম দৃশ্যের অন্যতম চরিত্র 'পুরুষ' (নেত্যর বাবা)। ‘পুরুষ' অর্থাৎ নেত্যর বাবা তার ঘুমন্ত ছেলে নেত্যকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলি বলেছে।
▻ গণনাট্য আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা বিজন ভট্টাচার্যের প্রথম নাটক ‘আগুন’ অভিনয়ের মাধ্যমে গণনাট্য সংঘের পথ চলা শুরু। নাট্যকার তাঁর এই পরীক্ষামূলক নাটকে পুরোপুরি সফল হতে না-পারলেও মন্বন্তরের পটভূমিকায় ভুখা উদ্বাস্তু কৃষক ও অন্নহীন মানুষের পাশাপাশি মধ্যবিত্তের জীবনসংগ্রামের ইতিহাসকেও স্পষ্ট করে চিত্রিত করেছেন। এ ছাড়াও কালোবাজারি, চোরাকারবারি ও মহাজনদের চরিত্রটিও এখানে উদ্ঘাটিত হয়েছে স্পষ্ট করে। নাটকের অন্যতম মূল বিষয়—চাল, চালের আকাল। বক্তা ‘পুরুষ' অর্থাৎ নেত্যর বাবার গলায় তা স্পষ্ট। নেত্যর বাবার আশঙ্কার কারণ হল বাস্তব অভিজ্ঞতা। আর সেই বাস্তব অভিজ্ঞতার সাক্ষী হল—মণিচাঁদ ও কুড়োনের মা । কারণ আগের দিনে মণিচাঁদ দেরিতে গিয়ে লাইনের শেষে দাঁড়িয়েছিল এবং নানান দোলাচলের মধ্য দিয়ে তার চাল পেতে পেতে বেলা বারোটা বাজে। কুড়োনের মায়ের অবস্থা ছিল আরও করুণ, কারণ দিনান্তে তাকে ফিরতে হয়েছে একেবারে খালি হাতে। তা ছাড়া নেত্যদের গ্রাম থেকে কলমি শাক, দাঁতন কাঠি, কলা শহরে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করতে হবে; কারণ সেই পয়সা নিয়েই দাঁড়াতে হবে চালের লাইনে। তাই ঘুম থেকে দেরিতে উঠলে তীব্র অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হবে—এমন আশঙ্কা থেকেই বক্তা কথাগুলি বলেছে।
Q6. ‘একটু হেসে ফের আবার ওই রকম করে তাকাচ্ছিস মুখপানে।–কে, কার উদ্দেশে কথাগুলি বলেছে? উক্তিটির মধ্য দিয়ে বক্তার যে ভাব ফুটে উঠেছে তা ব্যাখ্যা করো। (Mark : 2+3=5)
❑ মার্কসীয় বিশ্বাসে বিশ্বাসী, গণনাট্য আন্দোলনের অন্যতম ব্যক্তিত্ব বিজন ভট্টাচার্যের লেখা ‘আগুন' নাটক থেকে গৃহীত উদ্ধৃতাংশটির বক্তা দ্বিতীয় দৃশ্যে উল্লিখিত কৃষাণ। কৃষাণ তার স্ত্রী অর্থাৎ মিথ্যা আশ্বাসে জর্জরিত, নিশ্চল হয়ে যাওয়া কৃষাণির উদ্দেশ্যে কথাগুলি বলেছে।
▻ মার্কসীয় বিশ্বাসে নিজেকে গড়ে তুলে বিজন ভট্টাচার্য গণনাট্য সংঘে নাট্যরচনা, পরিচালনা ও অভিনয় করতে থাকেন। কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের জীবনসংগ্রাম ও বাঁচবার লড়াই তাঁর নাটকের মুখ্য বিষয় হয়ে উঠেছিল। অন্যদিকে ছিল কালোবাজারি, চোরাকারবারি ও মহাজনদের
শোষণ। এই শোষণ বঞ্চনার জাঁতাকলে পড়েও মেহনতি মানুষগুলো কিন্তু স্বপ্ন দেখায় ইতি টানতে পারেনি। এইরকমই এক কৃষকের স্বপ্ন দেখার কাহিনি দ্বিতীয় দৃশ্যের মূল উপজীব্য। কৃষক শুধু নিজে স্বপ্ন দেখেনি সে তার স্ত্রীকেও স্বপ্ন দেখিয়েছে—কিন্তু বারে বারে তা ব্যর্থ হয়েছে—নাটকে অন্তত কৃষকের স্বগতোক্তির বহিঃপ্রকাশে সে-কথাই ধরা পড়েছে। ইতিপূর্বে কৃষাণিও বহু স্বপ্ন দেখেছিল বা তাকে দেখানো হয়েছিল—যা আজও বাস্তবায়িত হয়নি। সেইজন্যই বোধহয় কৃষাণের দেখানো স্বপ্নে সে নির্লিপ্ত থেকেছে। এই নির্লিপ্ততাই কৃষাণের বিবেক বোধকে তীব্র আঘাত করেছে এবং তার চোখে যেন আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে স্বপ্নগুলো কতটা অন্তঃসারশূন্য। তা ছাড়া তীব্র খাদ্যাভাবের মাঝে কৃষাণ যখন শহরে গিয়ে তাড়াতাড়ি চাল সংগ্রহ করে ফিরে আসার পরামর্শ দেয় এবং নিজের খিদের কথা বলতে থাকে তখন কৃষাণি যেন আরও অবাক হয়ে যায়। তখন মন্বন্তরপীড়িত যুগকে কিংবা পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকে কোথাও যেন কৃষাণি একটা ঘৃণা করতে থাকে। যেটা তার দৃষ্টির মধ্যে প্রকাশিত হচ্ছিল—যা দেখে কৃষাণ উদ্ধৃত উক্তিটি করেছে। তার এই নিশ্চুপ থাকাটা ছিল প্রলয়ের আগের নিস্তব্ধতা স্বরূপ।
Q7. দ্বিতীয় দৃশ্যে কৃষাণের যে অসহায়তা ফুটে উঠেছে তা লেখো।
❑ গণনাট্য সংঘের প্রথম প্রয়াস ‘আগুন’। এই নাটকে মোট পাঁচটি দৃশ্য উল্লেখ করেছেন নাট্যকার। দ্বিতীয় দৃশ্যে উল্লেখ আছে এক কৃষক পরিবারের। নাটকে উল্লেখিত বিভিন্ন পরিবারের সমস্যা কিন্তু এক—চাল, চালের আকাল। পঞ্চাশের মন্বন্তরের কিছু আগেই খাদ্য মজুত করে কৃত্রিম খাদ্যাভাব সৃষ্টি ও তদ্জনিত সমস্যা এ নাটকের মূল উপজীব্য। প্রথম চারটি দৃশ্যের মধ্য দিয়ে নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য সমস্যার সংকটময় রূপটি দর্শকের সামনে নিয়ে আসতে সমর্থ হয়েছেন। এই দৃশ্যে বক্তা একমাত্র কৃষাণ। কৃষাণের কথায় এ দৃশ্যে তার স্ত্রীর উপস্থিতি টের পাওয়া গেলেও কৃষাণি কিন্তু নিশ্চুপ থেকেছে। কৃষাণির এই মৌনতা কৃষাণকে আরও বেশি আঘাত করেছে এবং অসহায় অবস্থায় দর্শকের কাছে দাঁড় করিয়েছে। কৃষাণ যখন চৈতের ফসল তুলে কিছুদিন নিশ্চিন্ত থাকার স্বপ্ন দেখছেন বা কৃষাণিকে সে স্বপ্ন দেখাচ্ছেন, ঠিক সেই সময় কৃষাণির নিরুত্তর থাকাটা কৃষাণকে আঘাত করেছে। কৃষাণ হাসি মুখে নিছক মামুলি কিছু কথা বলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু কৃষাণি শুধুমাত্র দুলে ওঠে। এরপরেই কৃষক তার দেখা স্বপ্ন বা দেখানো স্বপ্ন যে বাস্তব রহিত নিজেই সে-কথা স্বীকার করেছে। এতৎসত্ত্বেও কৃষক তার স্ত্রীর মৌনতা ভাঙতে আবারও কটা দিন কষ্ট করার কথা বলে এবং তাড়াতাড়ি ফিরে আসার জন্য তাড়াতাড়ি গিয়ে চালের লাইনে দাঁড়াতে বলে। শুধু তাই নয় নিজের ক্ষুধার কথা বলে নারীসুলভ ভাবাবেগে আঘাত দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে চেষ্টা করে কিন্তু কৃষাণির নিশ্চুপ থেকে তাকানোর মধ্যে অনেক কথাই কৃষাণকে বুঝিয়ে দেয়। এ দৃশ্যে সত্যিকারেরই কৃষাণকে ভীষণই অসহায় লেগেছে।
Q8. ‘আগুন' নাটকের তৃতীয় দৃশ্যে সতীশ চরিত্রটি আলোচনা করো?
❑ ভারতীয় গণনাট্য সংঘের পথ চলা শুরু হয়েছিল বিজন ভট্টাচার্যের প্রথম নাটক আগুন (১৯৪৩)-এর অভিনয়ের মাধ্যমে। বিজন ভট্টাচার্য তাঁর ‘নবান্ন’নাটকের ভূমিকায় লিখেছেন—‘তদানীন্তন সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষিতে আগুন ছিল একটি পরীক্ষামূলক ক্ষুদ্র নাটিকা।' এখানে তিনি পুরোপুরি সফল হতে না-পারলেও মন্বন্তরের পটভূমিকায় ভুখা উদ্বাস্তু কৃষক, মধ্যবিত্ত মানুষের পাশাপাশি শ্রমিক শ্রেণির জীবনসংগ্রামের ইতিহাসকেও স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন। অন্যান্য শ্রেণির মানুষের সাথে সাথে কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের জীবনসংগ্রাম ও বাঁচবার লড়াই তাঁর নাটকের মুখ্য বিষয় হয়ে উঠেছিল। তৃতীয় দৃশ্যে আমরা কারখানার শ্রমিক সতীশের জীবনসংগ্রাম ও বাঁচবার লড়াই প্রত্যক্ষ করেছি। যুদ্ধের প্রাক্কালে কালোবাজারি, চোরাকারবারি ও মহাজনদের শোষণে সমাজের এই প্রান্তিক মানুষগুলোর যে দুর্দশা হয় সতীশ চরিত্রের বিশ্লেষণ করলেই সহজে তা চোখে পড়ে। সতীশ কারখানায় কাজ করে। মেয়ে ফুলকি ও স্ত্রী ক্ষিরি এই নিয়ে তার সংসার। তিনজনের সংসারে যেভাবে অশান্তির আগুন ছড়িয়ে পড়েছে তার একমাত্র কারণ—চাল, চালের আকাল। অভাব যে মানুষকে কতটা নীচ ও হিংস্র করে তোলে তা সতীশ চরিত্রের মধ্যে লক্ষ করা যায়। নাটকে সতীশ একজন ব্যর্থ পিতা ও স্বামী—এই সত্যটা স্ত্রী ক্ষিরির মুখে শুনে নিজেকে ঠিক রাখতে পারেনি। নিজের ব্যর্থতাকে ঢাকতে সে তার স্ত্রীকে লাথি মারে- যার দ্বারা বাস্তবকে স্তব্ধ করে দিতে চায় সে। সংসারের প্রকৃত অবস্থা জেনেও সতীশের আস্ফালন আর যাই হোক কোনো সুস্থতার লক্ষণ বলে মনে হয়নি। সে কারখানায় কাজে যাবে বলে তাকেই একমাত্র খেতে হবে; স্ত্রী, কন্যা কী খাবে তা একবারও চিন্তা করেনি। এক্ষেত্রে পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় একজন স্বার্থপর মানুষ বলেই তাকে মনে হয়। আসলে অভাব, দারিদ্র্যতা মানুষের সুকুমার প্রবৃত্তিগুলিকে সর্বদাই ধ্বংস করে দেয়। সতীশও সে পথেরই পথিক।
Q9. সতীশের স্ত্রী ক্ষিরি চরিত্রটি সম্পর্কে আলোচনা করো।
❑ প্রখ্যাত নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য গণনাট্য সংঘের অনুপ্রেরণা ও উৎসাহেই প্রথম লেখেন ছোট্ট নাটিকা 'আগুন'। বাংলাদেশে মহামন্বন্তরের ভয়াবহ দুর্যোগের দিনে তিনি বাংলার গ্রামেগঞ্জে ঘুরে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন, মানুষের ব্যথাবেদনাকে আত্মস্থ করেছেন, তাদের প্রাণের কান্না কান পেতে শুনেছেন। মন্বন্তর ও দুর্যোগজনিত কারণে বিধ্বস্ত গ্রামবাংলার সহস্র নারী সেদিন পুরুষের সঙ্গে থেকে সংগ্রাম করে সমাজকে রক্ষা করতে সচেষ্ট হয়েছিল।
‘আগুন' নাটকে আমরা যে নারীচরিত্রগুলি পাই তারা হল—নেত্যর মা, কৃষাণের বউ, ক্ষিরি ওরফে সতীশের বউ এবং হরেকৃষ্ণ কেরানির বউ মনোরমা। নেত্যর মা পুরুষ অর্থাৎ নেত্যর বাবার সঙ্গে সরাসরি কোনো কথা নাটকে প্রথম দৃশ্যে বলেনি। নীরবে সংসার রক্ষার একনিষ্ঠ সৈনিক হিসেবে কাজ করে গেছে। দ্বিতীয় দৃশ্যে কৃষাণিকে দিয়ে নাট্যকার একটি কথাও বলায়নি। তৃতীয় দৃশ্যে কিন্তু আমরা পেয়ে যাই তিরিক্ষি মেজারের ক্ষিরিকে। কারখানার শ্রমিক সতীশের স্ত্রী ক্ষিরি। ক্ষিরি সাহসী ও সত্যবাদী। সে সতীশকে তার প্রকৃত বাস্তবটা বুঝিয়ে দিতে সমর্থ হয়েছে। তাই সতীশ কারখানা যাবার আগে খেতে চাইলে ক্ষিরি বাস্তবটা একেবারেই সামনে এনেছে। সে সতীশের ব্যর্থতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে। আর এতেই আত্মসম্মানে ঘা লাগে সতীশের এবং ক্ষিরিকে শক্তির আস্ফালনে লাথি মারে। সতীশরা ক্ষিরির মতো মেয়েদের বাস্তব প্রশ্নের কাছে অসহায় হয়ে পড়ে। অনাহার যে কতো গভীরতর অসুখ, তা যে মানুষকে কোথায় নামিয়ে আনতে পারে তা এই দৃশ্যে স্পষ্ট হয়েছে। অভাবের চেয়ে আত্মসম্মানবোধ যে আরও বড়ো তা ক্ষিরির মধ্যে লক্ষ করা যায়।
Q10. 'কী আমার পুরুষমানুষ রে?-কে, কার উদ্দেশে কথাটি বলেছে? বক্তার এই উক্তির মধ্যে যে শ্লেষাত্মক ভাবনা প্রকাশিত হয়েছে তা লেখো। (Mark : 2+3=5)
❑ ভারতীয় গণনাট্য সংঘের অন্যতম সদস্য লেখক, পরিচালক ও অভিনেতা বিজন ভট্টাচার্যের প্রথম নাটক 'আগুন' থেকে গৃহীত উদ্ধৃত অংশটির বক্তা হল তৃতীয় দৃশ্যের অন্যতম স্ত্রী চরিত্র ক্ষিরি। ক্ষিরি কথাটি তার স্বামী সতীশের উদ্দেশে বলেছেন।
▻ নাটকের তৃতীয় দৃশ্যে লক্ষ করা যায় এক শ্রমিক পরিবার। দুর্ভিক্ষ ও কালোবাজারি-জনিত কারণে সেখানে যেভাবে অভাব নেমে এসেছে এবং তারই সূত্রে পারিবারিক সম্পর্ক কীভাবে অশান্তির আগুনে পুড়তে থেকেছে তা লক্ষ করা যায়। সতীশ ও তার মেয়ে ফুলকি এবং স্ত্রী ক্ষিরিকে নিয়ে তিনজনের সংসার। মহাজন, কালোবাজারিরা সেসময় যেভাবে খাদ্য মজুত করে কৃত্রিম অভাব সৃষ্টি করেছিল তাতে সমাজের এই প্রান্তিক মানুষগুলোর পক্ষে দু-বেলা দু-মুঠো খাবার জোগাড় করাই মুশকিল হয়ে উঠেছিল। পরিবারের প্রধান হয়ে সতীশও অন্নের সংস্থান করতে ব্যর্থ; কিন্তু কোথাও গিয়ে সে যেন তা মানতে চায়নি। আর এতেই বিপত্তি। স্ত্রী ক্ষিরি সে তার সাধ্যমতো চেষ্টা করছে। চালের লাইনে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে কিন্তু চাল না-পেলে তার দোষ কোথায়। খিদের জ্বালার কাছে এই বাস্তবটাও মানুষ মানতে পারেনি। যেমনভাবে এ দৃশ্যে সতীশ মানতে পারেনি। আগের রাত্তিরে যে মানুষটা চাল ধার করে খিদে মেটায় সেই মানুষটাই সকালে উঠে কারখানায় যাওয়ার আগে খাবার চায়। সতীশের স্ত্রী ক্ষিরি এতেই বেজায় চটে যায় এবং দু-চার কথা শুনিয়ে দেয়। এতেই সতীশের পৌরুষত্বে আঘাত লাগে এবং ক্ষিরিকে তার কথার ট্যাকট্যাকানির জন্য যোগ্য সাজা দেবার কথা বলে। এ কথা শুনে ক্ষিরি উত্তেজিত হয়ে পড়ে এবং প্রতিবেশী কেলোর বাবার কথা তুলে ভর্ৎসনা করে এবং উক্ত কথাগুলি বলে।
Q11. হরেকৃষ্ণ ও মনোরমার চরিত্র আলোচনা করো।
❑ বিজন ভট্টাচার্যের 'আগুন' নাটকের কাহিনির দিকে যদি লক্ষ করি তবে সেখানে পাঁচটি দৃশ্য লক্ষ করা যায়। চতুর্থ দৃশ্যে নাট্যকার এক মধ্যবিত্ত পরিবারের ছবি তুলে ধরেছেন। দুজনের পরিবার সেটি। একজন কেরানি হরেকৃষ্ণবাবু ও অন্যজন তার স্ত্রী মনোরমা। প্রথম তিনটি দৃশ্যে যে তিনটি পরিবারের ছবি আমরা দেখেছি তার থেকে একটু আলাদা হরেকৃষ্ণবাবু ও মনোরমা দেবীর সংসার। সেখানেও খাদ্যসংকটের ছবি আছে কিন্তু অভাব-অনটনের জেরে অশান্তির ছবি ধরা পড়েনি।
হরেকৃষ্ণবাবুর ঈশ্বরে সম্পূর্ণ আস্থা না-থাকলেও মনোরমা দেবীর তা সম্পূর্ণরূপে আছে, তাই তো চালের লাইনে দাঁড়াতে যাওয়ার আগে মনোরমা দেবী হরেকৃষ্ণবাবুকে ঠাকুর নমস্কারের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। নির্বিবাদী হরেকৃষ্ণবাবু মনে না-নিলেও স্ত্রীর আদেশ মেনে ঠাকুর প্রণাম করেন। তবে তাতে যে খুব সুবিধা হবে সে-কথা তিনি মেনে নেননি। মনোরমা দেবী সুযোগসন্ধানী এবং কিছুটা স্বার্থান্বেষীও বলা চলে। ভোঁদার কাছে চাল দেওয়ার খবর শোনা কিংবা সিভিক গার্ডকে বলে কয়ে কিছু চিনি জোগাড় করার কথার মধ্যেই তা স্পষ্ট। হরেকৃষ্ণবাবু অফিসের অনিয়ম-বেনিয়ম দেখেও কিন্তু কোনো কিছু ব্যাপারেই মুখ খোলেনি—শুধুমাত্র দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া অন্যকিছু তার মধ্যে দেখা যায়নি। মধ্যম যে সবসময় তফাতে চলে তা হরেকৃষ্ণবাবুর আচার আচরণের মধ্যে পঞ্চম দৃশ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পঞ্চম দৃশ্যে আমরা হরেকৃষ্ণবাবুর ‘মুভমেন্ট’ দেখেছি কিন্তু সেভাবে অ্যাকসন ধরা পড়েনি। তবে শেষে সমবেত হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও হরেকৃষ্ণবাবু ছিলেন মাথা নাড়ার দলে। এককথায় হরেকৃষ্ণবাবুর মধ্যে অন্যায়ে প্রতিবাদ করার মতো তীব্র ক্ষমতা চোখে পড়েনি। লেখক হরেকৃষ্ণ ও মনোরমা দেবীকে প্রকৃত মধ্যবিত্ত বাঙালি রূপে গড়ে তুলেছেন।
Q12.‘যে রক্ষক সেই হল গিয়ে তোমার ভক্ষক।–বক্তা কোন প্রসঙ্গে এমন কথা বলেছেন? বক্তার এই উক্তির মধ্য দিয়ে সেই সময়কার কোন বাস্তবতা ফুটে উঠেছে? (Mark : 2+3=5)
❑ গণনাট্য আন্দোলনের পথিকৃৎ ও 'নবান্ন' নাটকের স্রষ্টা বিজন ভট্টাচার্যের ‘আগুন’ নাটক থেকে গৃহীত উদ্ধৃতাংশটির বক্তা হলেন চতুর্থ দৃশ্যে উল্লেখিত কেরানি হরেকৃষ্ণবাবু। কেরানি হরেকৃষ্ণবাবু যখন তার স্ত্রী মনোরমা দেবীর প্রশ্নের মুখে পড়ে—“অফিস থেকে বাবুদের সব দেওয়া থোওয়ার ব্যবস্থা হবে, তার কী হল!” সে-কথা শুনে বিরক্ত হয়ে অফিসের কেলেঙ্কারির কথা বলতে গিয়ে বক্তা এমন উক্তিটি করেছেন।
▻ নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্যের ‘আগুন’ নাটকের মূল বিষয় হল—পঞ্চাশের মন্বন্তরের কিছু আগেই একশ্রেণির কালোবাজারি ও মজুতদারের খাদ্য মজুত করে কৃত্রিম খাদ্যাভাব সৃষ্টি করা। সেজন্য সামাজিক সংকট তৈরি ও সমাজের সর্বস্তরের মানুষের দুর্ভোগ। নাটকের মূল বিষয় যে কাহিনির সর্বাংশে সংক্রমিত হবে এটাই স্বাভাবিক। চতুর্থ দৃশ্যে কেরানি হরেকৃষ্ণবাবু যখন খাদ্যসংগ্রহের জন্য এক তীব্র অনিশ্চয়তার মধ্যে লড়াই চালাচ্ছে, তখন তার স্ত্রী মনোরমা অফিস থেকে চাল-ডাল দেওয়ার প্রসঙ্গ তোলে। তখনই একরাশ বিরক্তি সহকারে হরেকৃষ্ণবাবু তার স্ত্রীর কাছে অফিসের কেলেঙ্কারির প্রসঙ্গ তোলে। তার কথায় বাবুদের নামে সস্তা দরে চাল-ডাল এনে কালোবাজারে তা চড়া দামে বিক্রি করে ম্যানেজার ও তার মোসাহেবরা বেআইনিভাবে অর্থ লুঠছে আর সাধারণ মানুষের কাছে বার্তা যাচ্ছে অফিসের লোকজনরা সস্তা দরে চাল-ডাল পাচ্ছে। কেরানি হরেকৃষ্ণবাবু সব জেনে শুনেও ক্ষুদ্র শক্তি নিয়ে প্রতিবাদ করার সাহস পায়নি। তাই আক্ষেপের সুরে তাকে বলতে শোনা যায়—“যে রক্ষক সেই হল গিয়ে তোমার ভক্ষক।” বক্তার উক্তির মধ্য দিয়ে সেই সময়ে কালোবাজারি যে সমাজে আঁকিয়ে বসেছিল, তার বাস্তবতাই ফুটে উঠেছে।
Q13. 'সুবিধে হবে বলে মনে করছ, আচ্ছা। - কে, কাকে উদ্দেশ্য করে কথাটি বলেছে? বক্তার উক্তির মধ্যে যে সন্দেহ ফুটে উঠেছে তা ব্যাখ্যা করো। (Mark : 2+3=5)
❑ প্রখ্যাত নট ও নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্যের প্রথম একাঙ্ক নাটক 'আগুন’ (১৯৪৩) থেকে গৃহীত উদ্ধৃতাংশটির বস্তা হল চতুর্থ দৃশ্যের অন্যতম চরিত্র কেরানি হরেকৃষ্ণবাবু। হরেকৃয়বাবু তার যোগ্য সহধর্মিনী মনোরমা দেবীকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলি বলেছে।
▻পঞ্চাশের মন্বন্তর ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে একশ্রেণির কালোবাজারি ও মজুতদারদের অপরিমেয় লোভজনিত কারণে বাংলায় দেখা দেয় ভয়াবহ খাদ্যাভাব। যার প্রভাব পড়েছিল সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, কৃষক, শ্রমিক ও মধ্যবিত্ত পরিবারে। দু-বেলা দু-মুঠো অন্নসংস্থান করতে গিয়ে সকলেই প্রায় দিশেহারা। চেনা শত্রুর চেয়ে অচেনা শত্রু যে আরও ভয়ংকর তা যেন পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল খাতসংকটের দিনগুলিতে। মজুতদার ও কালোবাজারিরা আড়ালে থেকে খাদ্যসংকট সৃষ্টি করে যেভাবে সমাজকে শোষণ করে যাচ্ছিল তা ছিল ভাকের। চতুর্থ দৃশ্যে মধ্যবিত্ত কেনানি হরেকৃষ্ণবাবুও স্বামী-স্ত্রী দুজনের অন্নসংস্থান করতে গিয়ে হিমসিম খাচ্ছিলেন। অফিস থেকে চাল-ডাল দেওয়ার কথা থাকলেও সেখানেও যে একটা অস্বচ্ছতা চলছে তা জেনেও প্রতিবাদ করতে সাহস পায়নি। এমনই একদিন আর পাঁচজনের মতো চালের লাইনে দাঁড়ানোর জন্য বাড়ি থেকে বেরুবার কথা বলে। সেই কথার প্রেক্ষিতে সমস্যাদীর্ণ মধ্যবিত্তের প্রতিনিধি হরেকৃষ্ণবাবু একপ্রকার অন্যস্থা প্রকাশ করে ঈশ্বরের প্রতি; যা তার—“সুবিধে হবে বলে মনে করছ, আচ্ছা।” এই উক্তিতেই প্রকাশিত। ঠাকুর দেবতায় বিশ্বাসী মধ্যবিত্তের এই উক্তির মধ্যে সামাজিক সংকটের কালে দেবতাও যে অসহায় সেই সন্দেহই ফুটে উঠেছে।
Q14. সিডিক গার্ডের চরিত্র আলোচনা করো।
❑ নট, নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য ছিলেন গণনাট্য সংঘের অন্যতম সদস্য। তাঁর ‘আগুন' নাটকের কাহিনির দিকে লক্ষ করলে সেখানে পাঁচটি দৃশ্য লক্ষ করা যায়। প্রথম চারটি দৃশ্যে বিভিন্ন শ্রেণির চারটি পরিবারের একই সমস্যা তুলে ধরা হয়েছে, তা হল চাল, চালের আকাল। পঞ্চম দৃশ্যটি হল নাটকের পরিণতি দৃশ্য। এই দৃশ্যে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে নানান সমস্যা—তা কখনও নিজেদের মধ্যে, কখনও-বা পুলিশের অযথা খবরদারি কিংবা দোকানদারের অপমানজনক মন্তব্যজনিত গণ্ডগোল। এই দৃশ্যেই আমরা সিভিক গার্ডকে অবতীর্ণ হতে দেখি স্বমহিমায়। কাউকে তোয়াক্কা না করেই সে তার আচরণের মাধ্যমে বারবার মন্বন্তর কবলিত মানুষগুলিকে অকারণে ভীতি প্রদর্শন করতে থাকে এবং আইনের ভয়ও দেখাতে শুরু করে। তার চরিত্রের সবচেয়ে বড়ো কলঙ্ক হল চালের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকে যারা তার চেয়ে বয়সে অনেকটাই বড়ো তাদের যথেচ্ছভাবে অপমান করা। বিশেষ করে প্রথম, দ্বিতীয় ও চতুর্থ পুরুষের ওপর সিভিক গার্ড বেশি নির্দয় ছিল। 'তাদের কাউকে টাকার চেঞ্জ না-আনার জন্য ভর্ৎসনা করছিল, কখনও-বা কেউ লাইন থেকে বিশেষ কারণে বাইরে বেরুলে তার ওপর মেজাজ দেখাচ্ছিল। এমনকি চতুর্থ পুরুষকে প্রকারান্তে কুকুর সম্বোধন করার মধ্য দিয়ে তার নীচ মানসিকতা প্রকাশ পায়। তবে চতুর্থ পুরুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করায় এবং তাকে সকলে সমর্থন করায় সিভিক গার্ড পিছু হঠতে বাধ্য হয়। আসলে কথায় আছে—'শক্তের ভক্ত নরমের যম। প্রতিরোধের মুখে পড়ে সিভিক গার্ড ও দোকানদার ভীষণভাবে ভয় পায় ও পিছু হঠে। সিভিক গার্ড এখানে আইনের পোশাক পরে শোষকের ছায়ামূর্তি হিসেবে দেখা দিয়েছে।
Q15. 'ছি, ছি, এসব কী অত্যাচার।-এই উক্তির আলোকে অত্যাচারীর অত্যাচার সম্পর্কে আলোচনা করো।
❑ বাংলায় গণনাট্য আন্দোলনের স্রষ্টা বিজন ভট্টাচার্যের অন্যতম পরীক্ষামূলক নাটক 'আগুন' থেকে গৃহীত উদ্ধৃতাংশটির বক্তা হল পঞ্চম দৃশ্যের অন্যতম প্রতিবাদী মুখ তৃতীয় পুরুষ। নাটকের পঞম দৃশ্যের অন্যতম প্রধান চরিত্র সিভিক গার্ড। তার কাজ ছিল মূলত দোকানে চালের জন্য দেওয়া লাইন ঠিক করা এবং মানুষের সুবিধা অসুবিধা দেখা, কিন্তু তার মুখে প্রথমেই শোনা যায় দোকানদারের কথার প্রতিধ্বনি, “খুচরো না হলে চাল পাওয়া যাবে না।” তা ছাড়া দীর্ঘক্ষণ লাইনে খঁড়িয়ে থাকা দ্বিতীয় পুরুষ প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বাইরে বেরুতে তাকে হাজারো কৈফিয়ত দিতে হয় এবং অপমানিত হতে হয়। আবার ঠিক সেইসময় বয়সে বেশকিছুটা বড়ো চতুর্থ পুরুষ (দুঃস্থ প্রকৃতির)-কে লাইন থেকে সামান্য বিচ্যুত হওয়ার কারণে সরাসরি গিয়ে গালে চপেটাঘাত করে এবং লাইন থেকে বের করে দেয়। সম্মিলিতভাবে তৃতীয় পুরুষ ও জনৈক মুসলিম ভাই ঘটনাটির প্রতিবাদ করে এবং সিভিক গার্ডের কাছে চপেটাঘাতের প্রকৃত কারণ জানাতে বলে। তখনও তার মধ্যে দেখা যায় মিথ্যা ঔদ্ধত্য ও আইনের অজুহাত। আসলে তৎকালীন সময়ে কালোবাজারি ও মজুতদারেরা সমাজে যে কৃত্রিম অভাব তৈরি করেছিল এবং মানুষ দিশেহারা হয়ে গিয়েছিল তাতে শাসকের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদত ছিল। আর শাসনযন্ত্রের সদস্য হয়ে সিভিক গার্ড সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার করে কোথাও যেন শাসকের হাতই শক্ত করছিল। তবে তৃতীয় পুরুষের লাগাতার প্রতিবাদ দেখে চতুর্থ পুরুষের মধ্যে সাহস সঞ্চারিত হয় এবং চতুর্থ পুরুষও প্রতিবাদ করতে থাকে। সেইসময় সিভিক গার্ড চতুর্থ পুরুষকে মারতে উদ্যত হলে সে প্রতিরোধ করে এবং তা মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে সমবেত আকার ধারণ করতেই সিভিক গার্ড পিছু হটে।
Q16.‘আগুন! আগুন জ্বলছে আমাদের পেটে।—বক্তার এই উক্তির ব্যাখ্যা করো।
❑ গণনাট্য আন্দোলনের পুরোধা এবং ফ্যাসিবাদ-বিরোধী নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্যের 'আগুন' নাটক থেকে গৃহীত উদ্ধৃতাংশটির বক্তা হল পনে দৃশ্যে উল্লেখিত জনৈক যুবক।
বিজন ভট্টাচার্য তাঁর 'আগুন' নাটকে প্রথম চারটি খণ্ডদৃশ্যের মধ্য দিয়ে মন্বন্তর ও যুদ্ধবিধ্বস্ত সময়ে সৃষ্ট সংকটময় সামাজিক পরিস্থিতির এক কোলাজ চিত্র দর্শকদের সামনে তুলে ধরতে সমর্থ হয়েছেন। পঞ্চম দৃশ্যে অর্থাৎ পরিণতি দৃশ্যে লক্ষ করা যায় সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ তাদের ভয়কে একটু একটু করে দূরে সরিয়ে বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে সংঘবদ্ধভাবে প্রতিবাদ করতে শিখছে। এই দৃশ্যে সিভিক গার্ড তার ক্ষমতার বলে দ্বিতীয় পুরুষকে লাইন থেকে বের করে দিতে উদ্যত হয় এবং একইভাবে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা চতুর্থ পুরুষকে বাইরে থেকে এসে লাইনে দাঁড়ানোর অভিযোগে চপেটাঘাত করে। প্রথমে চতুর্থ পুরুষ অনুনয়-বিনয় করে লাইনে ঢুকতে চায় কিন্তু সিভিক গার্ড কোনোমতেই তাতে কর্ণপাত করেনি। বরং উলটে তাকে কুকুরের সাথে তুলনা করে এবং তাতেই চতুর্থ পুরুষ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং সিভিক গার্ডকে জানোয়ার সম্বোধন করে। এইরকম উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হতে হতেই চতুর্থ পুরুষ ও সিভিক গার্ড হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়ে এবং তুমুল হট্টগোল শুরু হয়। পুলিশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের গর্জন ওঠে। এই সময়ই নাটকে বিবেক চরিত্রের মতো এক যুবক চেঁচিয়ে ওঠে—“আগুন,
আগুন!” সকলেই অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে কোথায়? সিভিক গার্ডও বিস্মিত হয়ে বলে—“আগুন! আগুন কিসের!” যুবক তখন প্রশ্নে উদ্ধৃত উক্তিটি করে আসলে যুবকের এই কথার মধ্যে বিশেষ এক ব্যঞ্জনা লুকিয়ে আছে। সকলেই যখন ক্ষুধার আগুনে পুড়ছে তখন নিজেদের এই অন্তর্কলহকে ব্যঙ্গ করেই যুবকের এমন উক্তি।
| Class - XI Bengali (2nd Semester) | |
|---|---|
| গল্প | |
| ছুটি | Click Here |
| তেলেনাপোতা আবিষ্কার | Click Here |
| কবিতা | |
| ভাব সম্মিলন | Click Here |
| লালন শাহ্ ফকিরের গান | Click Here |
| নুন | Click Here |
| নাটক | |
| আগুন | Click Here |
| পূর্ণাঙ্গ সহায়ক গ্রন্থ : পঞ্চতন্ত্র | |
| বই কেনা | Click Here |
| আজব শহর কলকেতা | Click Here |
| পঁচিশে বৈশাখ | Click Here |
| আড্ডা | Click Here |
বাংলা শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাস | তৃতীয় অধ্যায় : আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ধারা-গদ্যসাহিত্য | কাব্য কবিতার ধারা | বাংলা নাটক ও যাত্রার ধারা | উপন্যাস ও ছোটোগল্প | চতুর্থ অধ্যায় : লৌকিক সাহিত্যের নানা দিক | প্রবন্ধরচনা |মানস-মানচিত্র অনুসরণে -বিতর্কমূলক
| বাংলা শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাস | |
|---|---|
| তৃতীয় অধ্যায় : আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ধারা | |
| গদ্যসাহিত্য | Click Here |
| কাব্য কবিতার ধারা | Click Here |
| বাংলা নাটক ও যাত্রার ধারা | Click Here |
| উপন্যাস ও ছোটোগল্প | Click Here |
| চতুর্থ অধ্যায় : লৌকিক সাহিত্যের নানা দিক | Click Here |
| প্রবন্ধরচনা | |
| Click Here | |
